সুভাষচন্দ্র বসু (২৩ জানুয়ারি ১৮৯৭ – ১৮ আগস্ট ১৯৪৫) ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় জাতীয়তাবাদী নেতা, যিনি এই সংগ্রামে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। তিনি ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনীর সর্বোত্তম নেতা এবং আজাদ হিন্দ সরকারের প্রথম প্রধান ছিলেন। বিখ্যাত ভারতীয় কবি এবং নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে দেশনায়ক উপাধি দিয়েছিলেন। তিনি নেতাজি নামেও সমধিক পরিচিত। সুভাষচন্দ্র বসু পরপর দু'বার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে আদর্শগত সংঘাত, কংগ্রেসের বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নীতির প্রকাশ্য সমালোচনা এবং বিরুদ্ধ-মত প্রকাশ করার জন্য তাকে পদত্যাগ করতে হয়। পরবর্তী কালে তিনি অল ইন্ডিয়া ফরোয়ার্ড ব্লক নামে একটি রাজনৈতিক দল তৈরি করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পরেও তাঁর মতাদর্শের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি; বরং এই যুদ্ধে ব্রিটিশদের দুর্বলতাকে সুবিধা আদায়ের একটি সুযোগ হিসেবে দেখেন। যুদ্ধের সূচনালগ্নে তিনি লুকিয়ে ভারত ত্যাগ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন, জার্মানি ও জাপান ভ্রমণ করেন ভারতে ব্রিটিশদের আক্রমণ করার জন্য সহযোগিতা লাভের উদ্দেশ্যে। জাপানিদের সহযোগিতায় তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজ পুনর্গঠন করেন এবং নেতৃত্ব প্রদান করেন। এই বাহিনীর সৈনিকেরা ছিলেন মূলত ভারতীয় যুদ্ধবন্দী এবং সিঙ্গাপুরসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে কর্মরত মজুর। জাপানের আর্থিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তায় তিনি নির্বাসিত আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা করেন এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্বদান করে ব্রিটিশ মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে ইম্ফল ও ব্রহ্মদেশে (বর্তমান মায়ানমার) যুদ্ধ পরিচালনা করেন। উল্লেখ্য, কংগ্রেস কমিটি যেখানে ভারতের অধিরাজ্য মর্যাদা বা ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাসের পক্ষে মত প্রদান করে, সেখানে সুভাষচন্দ্রই প্রথম ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে মত দেন। জওহরলাল নেহরু-সহ অন্যান্য যুবনেতারা তাকে সমর্থন করেন। শেষ অবধি জাতীয় কংগ্রেসের ঐতিহাসিক লাহোর অধিবেশনে কংগ্রেস পূর্ণ স্বরাজ মতবাদ গ্রহণে বাধ্য হয়। ভগৎ সিংয়ের ফাঁসি ও তার জীবন রক্ষায় কংগ্রেস নেতাদের ব্যর্থতায় ক্ষুব্ধ সুভাষচন্দ্র গান্ধী-আরউইন চুক্তি বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। তাকে কারারুদ্ধ করে ভারত থেকে নির্বাসিত করা হয়। নিষেধাজ্ঞা ভেঙে তিনি ভারতে ফিরে এলে আবার তাকে কারারুদ্ধ করা হয়। ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্টে জাপান-শাসিত তাইওয়ানে একটি বিমান দুর্ঘটনায় আগুনে দাহ হয়ে সুভাষচন্দ্রের মৃত্যু হয়েছিল বলে মনে করা হয়। তবে উপযুক্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। অনেকেই এই বিমান দুর্ঘটনার বিষয়টি বিশ্বাস করেনি, কারণ তারা ভারতের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সুভাষচন্দ্রের প্রত্যাবর্তন আশা করেছিলেন।