Rohon Kuddus
Works (1)

Rohon Kuddus
এবার আর একটি ভালো লাগা বইয়ের কথা লিখি। বইটা ছোটদের, কিন্তু ছোট বড় সবার ভালো লাগবে। আমি তো পড়েছি এক নিঃশ্বাসে। যেমন লেখা, তেমন ছবি! বইটির নাম উত্তমকুমার এক বন্দুকবাজ বাঘের গল্প। যতই এগিয়েছে উত্তমকুমার নামে বন্দুকবাজ বাঘের গল্পটা, ততই জীবনের রঙ গাঢ় হয়েছে, ততই ছেলে-ভোলানো গপ্পো থেকে হয়ে উঠেছে ছোট বড় সকলের মন-ভোলানো কাহিনি। সত্যি কথা বলতে কী কিছুদূর এগোবার পর সন্দেহ হচ্ছিল উত্তমকুমারের চূড়ান্ত গন্তব্য নিয়ে। তখনও জানি না ওস্তাদের মার শেষ রাতে আর সেই মার অনায়াসে যার করায়ত্ব, তিনি লেখক রোহণ কুদ্দুস, ওর জন্য এক বিষণ্ণ কিন্তু অমোঘ ব্যবস্থার বন্দোবস্ত করে রেখেছেন। অবশ্য পাশাপাশি উচ্চারণ করতেই হয় তন্ময় বিশ্বাসের নাম। কী সব অসাধারণ ছবি এঁকেছেন পাতার পর পাতায়! এই বইয়ের কাহিনি সূত্রকে চোখের সামনে রঙে রঙে সাকার হয়ে উঠতে দেখাটা ভারী ভাল লাগার ব্যাপার। বিশেষত অনেক চরিত্রই যখন বাস্তব থেকে নেওয়া আর চেহারাও আঁকা হয়েছে তাদেরই আদলে। সবাই জানি শিশুসাহিত্য ব্যাপারটা মোটেই শিশুসুলভ নয়। কল্পনা, রোম্যান্স, সচেতনতা, কোমল অনুভূতির বিকাশ, মননশীলতা, নিজের পারিপার্শ্বিককে ভালবাসা, এডভেঞ্চার, সব নির্দিষ্ট মাপে মিশিয়ে দুরূহ, কিন্তু স্বর্গীয় ককটেল এক। সব বারটেন্ডারের আয়ত্বে নয় ব্যাপারটি। কঠিন কাজ, কিন্তু কিক ধাঁ করে মাথায় চড়ে বসে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই। আমাদের উত্তমকুমারও এইরকম। উনি মোটামুটি এলেন, দেখলেন, জয় করলেন টাইপ। আবার শিখর জয়ের পর যে বৈরাগ্য তাও শেখালেন যখন কোথায় চললে এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বাঘ 'দূরের ঘন বনের দিকে তাকাল একবার।… আমি আর হারুণ আল রশিদ উত্তমকুমার নামের সেই বাঘের পার্থিব কিছু সম্পত্তি হাতে দাঁড়িয়ে রইলাম। আর সূর্যের পড়ন্ত আলোয় দেখলাম, একটা হলুদ বাঘ কালো রঙের একটা ছাতা কাঁধে জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে।' তার আগেই অবশ্য ছোটরা কী বড়রা আশ্বাসিত হয়েছে, 'আমরা সবাই মনে মনে জানি, কোথাও না কোথাও গিয়ে ঠিকই পৌঁছে যায় সবাই। নিরুদ্দেশ তো আর সত্যি করেই কেউ হয় না।' সত্যি সত্যি যাইই জেনে থাকি, মূলত যাদের জন্য এই বই তাদের মধ্যে চারিয়ে যাক এই দুর্মর আশাবাদ যে কোনো না কোনো গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়াই যায়, চাঁদের পাহাড় বা সুন্দরবন হারিয়ে যাবার জন্য নয়। এই যে বড়রা একরকম বুঝবে, ছোটরা আরেকরকম, অথচ দু পক্ষের খুশি এসে মিলে যাবে বইটি পড়ার আনন্দে, পাশাপাশি এই দুটো ধারা উত্তমকুমারের শুরু থেকে শেষ অব্দি বহমান। কামালের দাদির পাঠানো লেবুর আচারে ফিদা বাঘ তার রোহণদাকে আচার মাখিয়ে খরগোশের মাংস খাওয়াতে চাইলে রোহণ আপত্তি জানিয়ে বলে, আমার আসলে খুব তাড়াতাড়ি হাঁটার অভ্যাস, ডাক্তার তাই খরগোশের মাংস খেতে বারণ করেছেন! ভালোমানুষ এই বাঘকে একমাত্র ভয় দেখাতে পারে টিভিতে গর্জনরত একমেবাদ্বিতীয়ম রোদ্দুর রায় (আর একবার তন্ময় বিশ্বাসের ছবির কথা না বলে পারলাম না, অসাধারণ, অপূর্ব, কোনো বিশেষণই যথেষ্ট নয়)। 'ঘরে রোদ্দুর রায়ের গান, বাথরুমে বাঘের গান। হোটেলের সেই ফ্লোরে যত লোক ছিল, সবাই একযোগে ফোন করে রুম সার্ভিসে খবর দিল হোটেলে হয় ডাকাত পড়েছে, নয়ত ভূমিকম্প হচ্ছে।' অথচ এই বাঘও নদীনালা সাঁতরে মনুষ্য বসতিতে ভুল করেই এসে উঠেছিল। তারপর তার যেমন খারাপ লাগেনি দোপেয়েদের বিচিত্র জীবনধারা, মানুষও তাকে প্রথমে ভয় পেলেও আপন করে নিতে দেরি করেনি। এমনকি বাঘকে সার্কাসে খেলা দেখিয়ে প্রভূত পয়সা রোজগার করা হারুণ আল রশিদও শেষ অব্দি তাকে সসম্মানে নিজ বাসভূমিতে ছেড়ে দিয়ে আসে। তবে অনেক অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ উত্তম কুমার এখন বিবাগী হবে না সংসারী, সে সকল তো তারই ইচ্ছা। একশ মজা পাতায় পাতায়, গল্পে ছবিতে। অবাক করে দেওয়া ঘটনার ঘনঘটা। তবু দুঃখী উত্তম কুমারের ধীর চলে যাওয়া যেন পেছন থেকে দাঁড়িয়ে আমিও দেখি। এমন প্রস্থানকে পিছু ডাকতে নেই, বড়রা তো বটেই, বাচ্চারাও তা বুঝবে। নৈঃশব্দকে সঙ্গী করে আমরা শেষ পাতায় বইটি বন্ধ করব। কিন্তু উত্তমকুমার বাঘের মতোই কাহিনিটি চিরকাল হরিষে বিষাদে মনে ছায়া ফেলবে। হযবরল শিশুসাহিত্যে উল্লেখযোগ্য একটি সংযোজনের অধিকারী হলেন। কাহিনি, ছবি ছাড়াও এই বইয়ের কাগজ আর ছাপার মান অতুলনীয়। এতো কম মূল্য ওরা ধার্য করলেন কোন মন্ত্রবলে, কে জানে!
Related writing
Nothing has been written about this author yet.